বন্ধু in need; বান্ধবী indeed
অবশেষে বাসটা রবীন্দ্রসদনের হলদিরাম
ছাড়ল দুপুর দেড়টা নাগাদ। একদম পেছনের লম্বা সিটটা অ্যাভয়েড করার জন্য তার আগের
সিটে বসেছিলাম। বাস তপসিয়া ছাড়াল নিজের গতিতে। কাবাবের গন্ধ নাকের মধ্যে দিয়ে মগজে
শব্দকল্পদ্রুম বানাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় চোখ পড়ল বাসের গেটের সামনে দাঁড়ানো একটি খুব
চেনা মুখের দিকে। কবি বলেছেন (কোন কবি জানি না, ‘কবি বলেছেন’ বললে শুনতে ভালো
লাগে) “বাঙালি যুবক পঁচিশেও কবিতা লিখলে সে যথার্থই কবি।” যাই হোক তেইশ বসন্তের
হংসধ্বনির বজ্রনির্ঘোষ হইল বিনা মেঘেই। অগত্যা হ্যাংলা দৃষ্টি হেনে বসে রইলাম।
মগজে কাবাবের গন্ধ, মাঝারি উচ্চতা,
চওড়া করে পরা কাজল, টেনে বাঁধা চুল, মাথায় খুব ‘সাধারনে অসাধারন’ করা একটা বাঁশের
কঞ্চির বানানো চুলের কাঁটা, শ্যাওলা-কালো খেসের শাড়ি, গলায়-কানে জাঙ্ক জুয়েলারি পরিমান
মত মিশে আমাকে মুরগি থেকে উটপাখি অবধি বাসা বানানো, ডিম পাড়া শুরু করেছিলো। আমার
মাথা থেকে কখন বেরিয়ে গিয়েছিল যে আমাকে কোথাও একটা নামতে হবে।হঠাত দেখি তিনি নেমে
গেলেন আমার দিকে শ্যেণদৃষ্টি হেনে। আমি যথারীতি ভেবলে গেছি। বাঁশের বাইরে থেকে
চিৎকার শুনলাম “লাস্ট স্টপেজ বইমেলা”। অগত্যা আগুনঝরা দৃষ্টির জন্য দুরুদুরু বুকে
নামলাম মিলনমেলা প্রাঙ্গণ।
নেমে খানিক এদিক ওদিক সেই পারফেক্ট
ব্রেইন ব্লেন্ডারকে খুঁজে বেড়ালাম।অবশেষে বিড়ালের কপালে শিকে ছেঁড়ার মত দেখলাম
তিনি যার সঙ্গে রীতিমতো জড়িয়ে ধরে গল্প জুড়েছেন তিনি আর কেউ নন, আমারই এক
বাল্যবান্ধবী, যার সাথে গত তিন বছরেও কথা হয়েছে কিনা মনে পড়ে না। আবার কবি বলেছেন
“বন্ধু ইন নিড, বান্ধবী ইনডিড”। বেশ ভারিক্কি চালে কানে ফোন নিয়ে বেশ জোরে জোরে
কথা বলতে বলতে সেই বান্ধবীটির সামনে দিয়ে ক্রস করার সাথে সাথে ঈশ্বর সহায় হলেন।
বেশ উৎফুল্ল আওয়াজে বান্ধবীটি ডেকে বসলো আমাকে। আমিও খুশির সাথে চমকে গিয়ে তার
কাছে গেলাম কুশল বিনিময়ের উদ্দেশ্যে। মাথার মধ্যে কি চলছে সে কেবল আমিই জানি। খুব
আনন্দের সাথে জানাল তারা দুজন মহিলা “একা” বইমেলা ঘুরতে এসেছে,আমি জয়েন করলে বড়
খুশি হবে ওরা। আমার বান্ধবীটি আলাপ করাল তার বান্ধবীর সাথে, নাম, নাহ থাক। নাম
বলবো না। এবার অফার এলো সেই নতুন বান্ধবীর দিক থেকেও। “তুই চল না আমাদের সাথে, খুব
আড্ডা হবে।” এমনিতে বইমেলা আমার একা ঘোরাই পছন্দের, কিন্তু আমার ভেতরে বাস করে
আরেক যুবক যে কিনা দুর্গাপূজোতে বান্ধবী খুঁজে চলেছে বিগত কয়েকবছর ধরে। সেই
বিবেকের দংশন এড়ানোর শক্তি আমাকে আমি আর দিতে পারলাম না। অগত্যা হাঁটতে থাকলাম।
এরপর শুরু হল কনফ্লিক্ট।আমার পছন্দ লিটল ম্যাগাজিন, তো তার পছন্দ বাংলা চ্যানেলের
স্টল। আমি গানের ম্যাগাজিনের স্টলে ঢুকি তো তারা বাইরের বুটিকে “এই রঙে আলাদা
ডিজাইন বা এই ডিজাইনে আলাদা রঙ” নিয়ে ব্যস্ত। মগজ বলে যাচ্ছে অন্য গেট দিয়ে পালাবার
কথা, কিন্তু ওই যে দুর্গাপূজো। অগত্যা পছন্দ মিলল এক জায়গাতে গিয়ে। কিছু শখের বাউল
চিরচেনা কিছু গানের গুঁতো মেরে যাচ্ছেন একদল শ্রোতাকে। মন্দের ভালো পেয়ে দাঁড়ালাম
সেখানে। সেও দেখলাম বেশ আগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়েছে আমার পাশে। আমার বাল্যবান্ধবীটি
ততক্ষণে আমার মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়ে গেছে। আমার সামনে দোতারা হাতে নব্য ভেকের
বাউলটি তখন ম্যাডক্স স্কোয়ারের দুগগা ঠাকুর। পাশের গিটারিস্ট, পারকাসনিস্টকে ঢাকির
মত লাগছে। আমার হাতের অপ্রয়োজনীয় লিফলেটগুলো অঞ্জলীর ফুলে রূপান্তরিত হয়েছে। ঘোর
ভাঙল গান শেষ হতেই। ছোটবেলার বান্ধবীটির কাছে হাতেনাতে ধরা পড়েছি। চোখে কপট রাগ
নিয়ে বেশ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলো। উত্তর দিয়ে বেরিয়ে আসাই যেত। কিন্তু ওই যে
দুর্গাপূজোর ব্যপারটা আছে না। সয়ে গেলাম। না, আমার পুরনো বান্ধবীটি তার বান্ধবীর
কাছে নাক কাটার মত এমন কিছু বলে নি। অগত্যা গল্প চলতে থাকলো। গল্পের গতি মোটামুটি
প্রিয় খাবার হয়ে সামনের শনিবার সাইমাতে মটন বিরিয়ানি খেতে যাওয়া পর্যন্ত এগিয়ে
গেছে। প্রিয় হিরোর নাম বলতে আকাশের দিকে চোখ টিপে শাহরুখের নাম বলতেই গল্প হিট।
কপাল জোরে শাহরুখের ব্যপারে একটাও প্রশ্ন করে নি বলে কপালকে ধন্যবাদ দিচ্ছি, তার
ফোন বেজে উঠলো। বেশ মিষ্টি করে তার কথা বলার ভাব দেখতে থাকলাম। ফোন রেখে আমার কাছে
এসে আলতো করে বলল “একটু ফুড কোর্টের সামনে যাবি রে?” অন্য কেউ হলে মুখের ওপর না
বলতে একটুও কষ্ট হতো না। কিন্তু এবার দুর্গাপূজোতে একা ঘোরা চলবে না। অগত্যা যেতেই
হল। গিয়ে দেখি উদগ্রীবভাবে একজন আইটির ভাইটি দাঁড়িয়ে আছেন, যাকে আর কোথাও কেমন
লাগবে জানা নেই, কিন্তু বইমেলায় মোটেই মানাচ্ছে না। আমাকে আলাপ করাল “আমার বন্ধু
হয় ও” বলে। এবার তার পরিচয় এলো এভাবে “ও সুদীপ্ত, ইউনিটেকে আছে, ও বই পড়তে মোটেও
ভালোবাসে না। খালি আমার জন্য এসেছে এখানে।” আমার পৃথিবী কাঁপতে শুরু করে দিয়েছে
ইতিমধ্যে। সেই ছোটবেলার বান্ধবীটি “দেখ কেমন লাগে” মার্কা ফিচেল হাসি দিলো।
এই অপমানের বদলা নিতেই হবে বলে মনে মনে
গাঁট গুনছি, সুযোগ এলো সঙ্গে সঙ্গে। সেই সুদীপ্তবাবু শুরু করলেন শো অফ করা। কারন
চোখে চোখে ঠাণ্ডা লড়াই শুরু হয়ে গেছে। প্রথম কথা শুরু হল আপেক্ষিক শত্রুপক্ষ থেকে।
“তোমরা কিছু খাবে না?” এক্ষেত্রে আইটি কর্মীদের একটা দুর্বল জায়গা আমার জানা। সেটা
হল খাবার শেষে সকলের বিল পে করতে চান ওনারা নিজেই। আমিও বদলা নেওয়ার মধুর সুযোগ আর
ছাড়লাম না। যজ্ঞে ঘৃতাহুতি দিলেন স্বয়ং তার প্রেমিকা। “ও সকাল থেকে আমাদের সাথেই
আছে, নিশ্চই খিদে পেয়েছে, চল না”, শুরু করলাম মগজের কেষ্ট ঠাকুরকে ঘুম পাড়ানো আর
পেটের রাহুকে জাগাবার মহাযজ্ঞ। একটা গোটাদিন বইমেলা নষ্ট করার মাশুল দিলো বেচারা
একজন নিপাট নিরীহ ভদ্র কর্পোরেটের ঘর পোড়া বাসিন্দা।
সে আগুন থেমেছিল ঝাড়া দুপ্লেট মটন বিরিয়ানি,
সুতি কাবাব, দুটো ফিরনী আর একটা বেনারসী পান খেয়ে। খুব ইচ্ছা করছিল বিলটা শেয়ার
করতে। এই মুহূর্তে রক্ষাকর্ত্রী হয়ে এলো আমার বাল্যবান্ধবীটি। কানে কানে বলল “এতো
কিছুর পরেও তুই বিল শেয়ার করবি? তুই না পুরুষ সিংহ?” ব্যস। ওমনি হাত-টাত মুছে সটান
বাসস্ট্যান্ড, সেখান থেকে বাস ধরে সাঁতরাগাছি।
আর সেই বাল্যবান্ধবীটির কথা ভাবছেন
নিশ্চয়ই? আজ্ঞে তিনি আমাকে সহ্য করে চলেছেন বিগত কিছু বছর যাবত।
Comments
Post a Comment